শাকসু নির্বাচন: আইনি জট কাটলেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভোট, উত্তাল ক্যাম্পাসে অবরুদ্ধ উপাচার্য
দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আইনি জটিলতায় ভেস্তে যেতে বসেছে শিক্ষার্থীদের সেই স্বপ্ন। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের পর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে শাবিপ্রবি ক্যাম্পাস। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, আইনি বাধা দূর হওয়া মাত্রই নির্বাচন আয়োজন করতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাতে অনুষ্ঠিত জরুরি সিন্ডিকেট সভা শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসার পরের দিনই নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হবে।
সিন্ডিকেটের জরুরি সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনের অবস্থান
হাইকোর্টের নির্দেশে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর সোমবার রাত সাড়ে আটটায় জরুরি বৈঠকে বসে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। প্রায় এক ঘণ্টার এই বৈঠক শেষে সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক জহির বিন আলম জানান, তিনজন শিক্ষার্থীর করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা ইতিমধ্যেই চেম্বার আদালতে আপিল করেছে।
অধ্যাপক জহির আরও স্পষ্ট করেন, ‘নির্বাচন কমিশন ভোটের জন্য শতভাগ প্রস্তুত। ব্যালট থেকে শুরু করে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। আমরা শিক্ষা উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের সঙ্গেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। মঙ্গলবার সকালে আবারও আদালতে আবেদন করা হবে। চেম্বার আদালত যদি আমাদের পক্ষে রায় দেন, তবে রায় পাওয়ার ঠিক পরের দিনই আমরা নির্বাচন আয়োজন করব।’
মহাসড়ক অবরোধ ও ভিসি অবরুদ্ধ
নির্বাচন স্থগিতের খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা। সোমবার দুপুর থেকেই ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। শাকসু নির্বাচনের দাবিতে ও স্থগিতাদেশের প্রতিবাদে ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ (ছাত্রশিবির সমর্থিত), ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে বেলা তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর, বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে অবরোধ তুলে নিয়ে আন্দোলনকারীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন।
এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকেই প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী, সহ-উপাচার্য মো. সাজেদুল করিম এবং কোষাধ্যক্ষ মো. ইসমাইল হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজ দপ্তরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত (রাত সাড়ে ১০টা) তাঁরা ভবনের ভেতরেই আটকা ছিলেন।
আইনি প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, নির্বাচন প্রক্রিয়ার ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণে সংক্ষুব্ধ হয়ে দুজন প্রার্থী ও একজন সাধারণ শিক্ষার্থী উচ্চ আদালতে রিট করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার হাইকোর্ট শাকসু নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ২৮ বছর পর যখন উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, ঠিক তার আগের দিন এমন সিদ্ধান্তে হতাশ হয়ে পড়েন হাজারো শিক্ষার্থী।
পরবর্তী পদক্ষেপ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে এবং পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। সিন্ডিকেট বৈঠকের পর রাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর এবং আইনি লড়াইয়ের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে তারা তাদের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
আপাতত শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নির্বাচনের পথ খোলার চেষ্টা, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার অনড় অবস্থান—সব মিলিয়ে শাকসু নির্বাচনের ভবিষ্যৎ এখন আদালতের রায়ের দিকেই তাকিয়ে আছে