বাংলাদেশসর্বশেষ সংবাদ

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব শেষে কে কোথায়: পতাকাবিহীন গাড়িতে ফিরবেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী দেড় বছরের আলোচিত শাসনকাল শেষে বিদায়ঘণ্টা বাজছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। আগামীকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে যবনিকা ঘটবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন শেষে উপদেষ্টারা ফিরে যাবেন তাঁদের আপন ভুবনে—কেউ শিক্ষকতায়, কেউ অধিকার আদায়ে, আবার কেউবা লেখালেখি ও গবেষণায়।

বিদায়ের এই ক্ষণটি হতে যাচ্ছে বেশ প্রতীকী। নিয়ম অনুযায়ী, শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে উপদেষ্টারা যাবেন জাতীয় পতাকাবাহী গাড়িতে চড়েই। তবে অনুষ্ঠান শেষে যখন তাঁরা ফিরবেন, তখন সেই একই গাড়ি থাকলেও, তাতে আর উড়বে না জাতীয় পতাকা।

ড. ইউনূসের অভিধানে ‘অবসর’ নেই
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা হস্তান্তরের পর কী করবেন, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তাঁর প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, ড. ইউনূসের জীবনদর্শন ও কর্মপরিকল্পনায় ‘রিটায়ার্ড’ বা অবসর বলতে কোনো শব্দ নেই।

আগামীকাল নতুন মন্ত্রিসভার কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পর তিনি হয়তো নতুন কোনো কর্মপরিকল্পনায় নিজেকে যুক্ত করবেন। বিশ্বজুড়েই তিনি সামাজিক ব্যবসা, ক্ষুদ্রঋণ এবং ‘থ্রি জিরো’ ভিশন (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ) নিয়ে কাজ করে আসছেন। দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি আবারও দারিদ্র্য বিমোচন ও পরিবেশ রক্ষার মতো বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতে পূর্ণোদ্যমে ফিরবেন বলে জানা গেছে।

ক্লাসরুমে ফিরছেন আসিফ ও সালেহউদ্দিন
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল আবারও ফিরে যাচ্ছেন তাঁর পুরনো ঠিকানায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই অধ্যাপক জানিয়েছেন, তিনি শিক্ষকতা পেশাতেই ফিরবেন। পাশাপাশি মৌলিক আইন ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখালেখি এবং গবেষণা অব্যাহত রাখবেন। নতুন মন্ত্রিসভায় থাকার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘এর কোনো প্রশ্নই আসে না।’

অন্যদিকে, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদও বেছে নিচ্ছেন শিক্ষকতার জীবন। দায়িত্ব শেষে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগ দেবেন বলে নিশ্চিত করেছেন।

বেলায় ফিরছেন রিজওয়ানা, ব্রতীতে শারমীন
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ‘বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি’ (বেলা)-তে যোগ দেবেন। পরিবেশ রক্ষায় আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।

সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ ফিরে যাবেন তাঁর সংগঠন ‘ব্রতী’তে। সেখানে মানবাধিকার ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে কাজের পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া নারীদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি।

লেখালেখি ও বিশ্রামে থাকবেন যাঁরা
প্রশাসন ও লেখালেখির জগতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আরও কয়েকজন উপদেষ্টা। বিশেষ সহকারী পদমর্যাদার উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানিয়েছেন, তিনি আগের মতোই বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন এবং সংবাদপত্রে নিয়মিত কলাম লিখবেন।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, টানা কাজের ধকল কাটাতে তিনি কিছুদিন পূর্ণ বিশ্রাম নেবেন। এরপর তিনিও লেখালেখিতে মনোযোগ দেবেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও রমজান মাসের পর থেকে বই পড়া ও লেখালেখির জগতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।

শেষ কর্মদিবসের চিত্র
কাগজ-কলমে দেড় দিন সময় বাকি থাকলেও গতকাল রবিবারই ছিল উপদেষ্টাদের শেষ কর্মব্যস্ত দিন। এদিন অনুষ্ঠিত হয় উপদেষ্টা পরিষদের শেষ বৈঠক। বৈঠকের পর অনেকেই সচিবালয়ে নিজ নিজ দপ্তরে গিয়ে বিদায়ী মতবিনিময় করেছেন এবং ফাইলপত্র গুছিয়ে নিয়েছেন। আজ সোমবার অনেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে দপ্তর থেকে বিদায় নেবেন।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘তাঁরা সবাই এই দেশেরই গর্বিত সন্তান। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব শেষেও তাঁরা দেশেই থাকছেন এবং ভবিষ্যতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশকে এগিয়ে নিতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন।’

আগামীকাল নতুন সরকারের শপথের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *