নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে হুমকি ও বিচারিক কাজে বাধা: রুমিন ফারহানার কৈফিয়ত তলব করল অনুসন্ধান কমিটি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনে উত্তাপ ছড়িয়েছে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। এবার খোদ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে হুমকি প্রদান ও বিচারিক কাজে বাধা সৃষ্টির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই আসনের আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় ব্যাখ্যা চেয়ে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি।

ছবি: প্রথম আলো
সোমবার (২০ জানুয়ারি) এই নোটিশ জারি করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির চেয়ারম্যান এবং সিনিয়র সিভিল জজ মো. আশরাফুল ইসলাম।
যে কারণে শোকজ
কমিটি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের ইসলামাবাদ এলাকায় নির্বাচনী বিধি উপেক্ষা করে মঞ্চ তৈরি করে জনসভা করছিলেন রুমিন ফারহানা। খবর পেয়ে সেখানে আচরণবিধি রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে যান কর্তব্যরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় রুমিন ফারহানা ও তার কর্মী-সমর্থকরা সংঘবদ্ধ হয়ে একটি অরাজক পরিস্থিতি (মব) তৈরি করেন। এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং তার বিচারিক কাজে সরাসরি বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এমনকি তাকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে’ হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে গত রোববার সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির কাছে রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে চিঠি পাঠান।
আইনি বিধি ও নির্দেশাবলি
ভিডিও ফুটেজ ও অভিযোগ পর্যালোচনা করে বিচারিক কমিটি জানিয়েছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানার এমন আচরণ ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এর অনুচ্ছেদ ৮৪(ক) এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫ এর বিধি ৬, ১৩ ও ১৮-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এমতাবস্থায়, কেন তার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ পাঠানো হবে না—তা জানতে চাওয়া হয়েছে। আগামী ২২ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) দুপুর ২টার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা আদালতের সিভিল শাখায় স্থাপিত নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির অস্থায়ী কার্যালয়ে রুমিন ফারহানাকে সশরীরে বা লিখিতভাবে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য ও রুমিনের প্রতিক্রিয়া
সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া নিশ্চিত করেছেন যে, বিচারিক কমিটির নির্দেশনানুযায়ী সোমবার রাতেই রুমিন ফারহানার কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশটি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রুমিন ফারহানা। এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া নোটিশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি গণমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একই অপরাধে তিনবার সাজা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এমন প্রশাসনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে সম্ভব?’ তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশনার এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
বিএনপি নেতাদেরও শোকজ
এদিকে নির্বাচনী মাঠের পরিবেশ বজায় রাখতে রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের জেরে বিএনপি ও যুবদলের দুই নেতাকেও শোকজ করেছে একই কমিটি।
রুমিন ফারহানাকে নিয়ে অশালীন ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়ায় আশুগঞ্জ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আলমগীর খাঁ এবং তার পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে আপত্তিকর ও মানহানিকর মন্তব্য করায় আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আলমগীর খাঁকে বুধবার এবং হাবিবুর রহমানকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের এই পাল্টাপাল্টি ঘটনায় সরাইল-আশুগঞ্জের নির্বাচনী পরিবেশ এখন টানটান উত্তেজনায় পূর্ণ। ২২ জানুয়ারি বিচারিক কমিটির সিদ্ধান্তের দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।

