গণভবনের দেয়ালে জুলাইয়ের রক্তস্নাত ইতিহাস: জাতির ক্রান্তিলগ্নে এই জাদুঘরই হবে দিশারি, বললেন ড. ইউনূস
একসময়ের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু গণভবন এখন গণমানুষের বিজয়ের স্মারক। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে অমলিন রাখতে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বিকেলে জাদুঘরটির চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ পরিদর্শন শেষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস মন্তব্য করেছেন, ভবিষ্যতে জাতি যদি কখনো পথ হারায়, তবে এই জাদুঘরই সঠিক গন্তব্যের সন্ধান দেবে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলনের ইতিহাস এবং বিগত সরকারের ১৬ বছরের শাসনের চিত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে এই জাদুঘরে। প্রধান উপদেষ্টা আজ সশরীরে ঘুরে দেখেন সেই সময়ের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন নিদর্শন। পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, ‘শহীদদের রক্ত শুকিয়ে যাওয়ার আগেই আমরা এই স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পেরেছি, যা বিশ্বজুড়ে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। আমরা প্রার্থনা করি, ভবিষ্যতে যেন এমন জাদুঘর আর কখনোই তৈরির প্রয়োজন না হয়। তবে জাতি যদি কখনো দিশাহারা হয়ে পড়ে, তবে এখান থেকেই তারা পুনরায় উঠে দাঁড়ানোর শক্তি ও দিকনির্দেশনা পাবে।’
আয়নাঘরের অভিজ্ঞতা ও নাগরিকদের প্রতি আহ্বান
জাদুঘরটি কেবল দেখার জায়গা নয়, বরং অনুভবের জায়গা—এমনটিই মনে করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিক, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের দলবেঁধে এখানে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এখানে একটি দিন কাটালে মানুষ উপলব্ধি করতে পারবে, কী নির্মম ও নৃশংস পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এই জাতিকে যেতে হয়েছে।’
জাদুঘরে প্রতীকীভাবে তৈরি ‘আয়নাঘর’গুলোর প্রসঙ্গ টেনে ড. ইউনূস বলেন, ‘কেউ যদি চায়, তবে এই আয়নাঘরগুলোতে কয়েক ঘণ্টা বা পুরো একটা দিন কাটাতে পারবে। সেই সময়ের ভুক্তভোগীদের মানসিক যন্ত্রণা ও বিভীষিকা অনুভবের সুযোগ রাখা হয়েছে এখানে।’
যা আছে জাদুঘরে
জাদুঘরটিতে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ ভাস্কর্য, ছবি ও অডিও-ভিজুয়ালের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে। সংরক্ষিত আছে শহীদদের রক্তমাখা পোশাক, হাতে লেখা চিঠি, গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং সমসাময়িক পত্রিকার কাটিং। বিশেষ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য এবং গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার চিত্রও দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে প্রধান উপদেষ্টা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্মিত ১৫ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্র উপভোগ করেন। এতে বিগত শাসনামলে রাষ্ট্রীয় মদদে গুম, বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
স্বেচ্ছাশ্রম ও ত্বরিত নির্মাণ
এত অল্প সময়ে এমন একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার কাজ শেষ হওয়াকে ‘রেকর্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেন, ‘গত আট মাস ধরে অনেক তরুণ-তরুণী কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। তাদের অক্লান্ত চেষ্টাতেই আজ এই জাদুঘর দৃশ্যমান। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই।’
জাদুঘরের কিউরেটর তানজীম ওয়াহাব এবং স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম খানের নেতৃত্বে গবেষক দল প্রধান উপদেষ্টাকে পুরো আয়োজন ঘুরিয়ে দেখান।
উপস্থিত ছিলেন যারা
প্রধান উপদেষ্টার এই পরিদর্শনে তার সঙ্গে ছিলেন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
উপদেষ্টাদের মধ্যে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম, গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং প্রধান উপদেষ্টার এসডিজি বিষয়ক সমন্বয়ক লামিয়া মোর্শেদ।
বিগত সময়ে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি এবং গুম থেকে ফিরে আসা মীর আহমদ বিন কাসেম আরমানও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। জুলাই বিপ্লবের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছাত্রনেতা ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং হাসনাত আবদুল্লাহও প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী ছিলেন।



