রাজনীতি

বরিশাল-৫ আসনে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের নজির: মুফতি ফয়জুল করীমের সমর্থনে সরে দাঁড়ালেন জামায়াত নেতা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিরল সৌজন্যতার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। বরিশাল-৫ (সদর ও সিটি করপোরেশন) আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের প্রতি সম্মান জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুয়াযযম হোসাইন হেলাল।

বরিশাল-৫ আসনে জামায়াত প্রার্থী মুয়াযযম হোসাইন হেলাল (ডান থেকে তৃতীয়) প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায়ছবি: প্রথম আলো

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে নাটকীয় কোনো ঘটনা ছাড়াই জামায়াতের এই কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। এর ফলে সদর আসনে ভোটের সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার ইঙ্গিত মিলছে।

সৌজন্যতার রাজনীতি ও জামায়াতের বার্তা
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মুয়াযযম হোসাইন হেলাল জানান, এটি দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘‘আমিরে জামায়াতের নির্দেশে এবং রাজনৈতিক সৌজন্যবোধ থেকেই মুফতি ফয়জুল করীমের আসনে আমি সরে দাঁড়িয়েছি। যারা আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের সাথী হয়েও শেষ মুহূর্তে জোটবদ্ধ হননি, তাদের সঙ্গে হৃদ্যতা ও সংযোগ পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যেই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে।’’

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গত ১৮ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের পর জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, ইসলামী আন্দোলনের এই শীর্ষ নেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই তারা বরিশাল-সদরে প্রার্থী না রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ফয়জুল করীমের প্রতিক্রিয়া: ঐক্যের ডাক
জামায়াত প্রার্থীর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। তিনি বিষয়টিকে দেশের রাজনীতির জন্য একটি ইতিবাচক ও পরিশীলিত অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন।

প্রথম আলোকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় ফয়জুল করীম বলেন, ‘‘রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু একে অপরের প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধই সুস্থ রাজনীতির পরিচায়ক। আমরা এর আগে জামায়াতের আমিরের আসনে এবং খেলাফত মজলিসের মামুনুল হকের আসনে প্রার্থী না দিয়ে যে সৌজন্যতা দেখিয়েছি, জামায়াত আজ তার প্রতিদান দিল। এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে দেশে শান্তির রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে।’’

ভোটের মাঠে নতুন মেরুকরণ
বরিশাল-৫ আসনটি ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। এখানে জামায়াত সরে যাওয়ায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন ইসলামী আন্দোলনের মুফতি ফয়জুল করীম এবং বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ও চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ারের মধ্যে হবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট বিভাজন রোধে জামায়াতের এই সিদ্ধান্ত ফয়জুল করীমের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

বরিশালের অন্যান্য আসনে চিত্র
মুয়াযযম হোসাইনের প্রত্যাহারের ফলে বরিশালের মোট ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতে জামায়াতের প্রার্থীরা বহাল রইলেন। এর আগে বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ভূইয়া ফুয়াদকে সমর্থন দিয়ে সেখানেও প্রার্থী দেয়নি জামায়াত।

তবে বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে চিত্রটি ভিন্ন। সেখানে মুফতি ফয়জুল করীম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জামায়াত ছাড় দেয়নি। ওই আসনে জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি মো. মাহমুদুন্নবী এখনও ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন জেলার ছয়টি আসনেই তাদের প্রার্থী বজায় রেখেছে।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ এক বছর ধরে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে থাকলেও, আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতানৈক্যের কারণে শেষ পর্যন্ত তারা একই জোটে নির্বাচন করছে না। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও একে অপরের শীর্ষ নেতাদের প্রতি এই ‘ছাড় দেওয়ার রাজনীতি’ ভোটারদের মাঝে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *