আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে নিজেদের নীতিগত রূপরেখা বা পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক জনসমক্ষে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনকে ঘিরে দলটির এই রূপরেখায় গণতান্ত্রিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিকদের মানবিক মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ‘পলিসি সামিট-২০২৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই রূপরেখা উপস্থাপন করেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের ৩০টি দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যা দলটির এই নীতিনির্ারণী সম্মেলনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বহন করে।
গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘকালের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে এক সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা একটি রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ ও দেশের শাসনব্যবস্থায় নতুন দিশা তৈরির একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে টিকে থাকাটা মূল সংকট নয়, বরং অর্জিত অবস্থান ধরে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি উল্লেখ করেন, দেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজ তাদের মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান পেতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে, দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করেও সাধারণ মানুষ সামান্য অর্থনৈতিক ধাক্ষায় দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে সততার সঙ্গে মোকাবিলার আহ্বান জানান তিনি।
অর্থনৈতিক দর্শনে পরিবর্তন: প্রবৃদ্ধি বনাম জনজীবন
জামায়াতের ঘোষিত রূপরেখায় প্রচলিত অর্থনৈতিক ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। শফিকুর রহমান বলেন, ‘শুধুমাত্র জিডিপি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচক দিয়ে জাতীয় সাফল্য পরিমাপ করা উচিত নয়। প্রকৃত অর্থনৈতিক সাফল্য তখনই আসবে, যখন মানুষ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারবে এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে।’
তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে দলটির অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, কর্মসংস্থানকে কেবল বিনিয়োগের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বা ‘প্রায়োরিটি’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার ওপরও তিনি জোর দেন।
প্রবাসী ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্তকরণ
‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে প্রবাসীদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে জামায়াতের এই রূপরেখায়। দলটির আমির বলেন, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা তাদের ঘামঝরানো রেমিট্যান্স দিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। তবে তাদের অবদানকে কেবল অর্থের মাপকাঠিতে বিচার না করে, তাদের দক্ষতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগাতে হবে।
এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশি চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদদের দেশের সংস্কার কাজে লাগানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। তিনি জানান, প্রবাসীরা কেবল অর্থ পাঠাতেই নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা দিতে এবং রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।
নারীর অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্ব
নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে জামায়াত। সম্মেলনে শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি কেবল ন্যায়বিচারের বিষয় নয়, এটি একটি কঠোর অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা। তিনি বলেন, ‘জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে পেছনে ফেলে বা পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো দেশই টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।’ এ সময় নারীদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কাঠামোগত বাধাগুলো দূর করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ঐক্যের ডাক
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে রাষ্ট্র, নাগরিক, সরকারি-বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে অংশীদারত্বের ওপর জোর দিয়েছে জামায়াত। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্পৃক্ততা এবং যৌথ দায়িত্ববোধের মাধ্যমেই একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব।
৩০ দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই পলিসি সামিটকে দেশের রাজনৈতিক মহলে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে জামায়াতের এই বিস্তারিত রূপরেখা ভোটার এবং আন্তর্জাতিক মহলে দলটির অবস্থান পরিষ্কার করার একটি প্রয়াস হিসেবে মনে করা হচ্ছে।