ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের ‘বিস্ফোরণ’: তিন দশকের রেকর্ড ভেঙে নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গত তিন দশকের সমস্ত রেকর্ড চূর্ণ করে এবার জাতীয় সংসদে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান জানান দিয়েছে ইসলামপন্থী দলগুলো। এবারের নির্বাচনে ১১টি ইসলামপন্থী দল সম্মিলিতভাবে ৭২টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর সর্বোচ্চ।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত সর্বশেষ ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কেবল আসনের সংখ্যাই নয়, বরং প্রাপ্ত ভোটের হারের দিক থেকেও ইসলামপন্থীরা এক বিশাল লাফ দিয়েছে। অতীতে যেখানে সব ইসলামপন্থী দল মিলে ১৫ শতাংশ ভোটের গণ্ডি পার হতে পারছিল না, সেখানে এবার তারা সম্মিলিতভাবে ৩৮ শতাংশের বেশি ভোট পকেটে পুরেছে।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। এ উপলক্ষে সেখানে সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। গতকাল সংসদ ভবন এলাকায়ছবি: সাজিদ হোসেন

জামায়াতের একক আধিপত্য ও চরমোনাইয়ের অভিষেক
এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের এই বিশাল অর্জনের সিংহভাগই এসেছে জামায়াতে ইসলামীর হাত ধরে। দলটির ২২৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬৮ জনই বিজয়ী হয়েছেন। একক দল হিসেবে তারা ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি পুনর্প্রতিষ্ঠা করেছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রথমবারের মতো সংসদের খাতা খুলেছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ২৫৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তারা ১টি আসনে জয়ী হতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া জামায়াতের নির্বাচনী মিত্র হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসনে জয় পেয়েছে। তবে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ৫টি আসনে লড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম কোনো আসনেই জয়ী হতে পারেনি।

অতীতের পরিসংখ্যান বনাম বর্তমান চিত্র
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা সর্বোচ্চ ১৯টি করে আসন পেয়েছিল। মাঝখানে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত মাত্র ২টি আসন পায় এবং ১৯৯৬ সালে ৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে তরিকত ফেডারেশনের মতো কিছু দল মহাজোটের অংশ হিসেবে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করলেও বড় ইসলামপন্থী দলগুলো ছিল ক্ষমতার বাইরে। বিশেষ করে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপি-জামায়াতসহ প্রধান দলগুলো বর্জন করায় ইসলামপন্থীদের প্রকৃত জনসমর্থন যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না।

উত্থান কি স্থায়ী, নাকি কৌশলগত?
ইসলামপন্থীদের এই অভাবনীয় জয়কে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান মনে করেন, এই সাফল্য যতটা না আদর্শিক, তার চেয়ে বেশি কৌশলগত। তার মতে, “এবার অনেক ইসলামপন্থী দল তাদের মূল ধর্মীয় এজেন্ডাগুলো কিছুটা আড়ালে রেখে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছে। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং মাঠের রাজনীতিতে বড় কোনো প্রতিপক্ষ না থাকাও তাদের এই বিপুল ভোট প্রাপ্তিতে সহায়তা করেছে।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আওয়ামী লীগের মতো বড় দল যদি ভবিষ্যতে আবারও নির্বাচনে ফেরে, তবে ইসলামপন্থীদের এই ভোটের হার কতটুকু বজায় থাকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

শপথের প্রস্তুতি ও আগামীর রাজনীতি
এদিকে, নির্বাচনের এই ফলাফলের পর এখন দেশজুড়ে নতুন সরকারের অপেক্ষা। বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। গতকাল থেকেই সেখানে সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়েছে।

বিএনপি এককভাবে ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তাদের প্রধান মিত্র জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর এই শক্তিশালী উপস্থিতি আগামী দিনের সংসদীয় বিতর্কে এবং নীতি নির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচনী রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের এই আকস্মিক ‘উত্থান’ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মেরুকরণে কী ধরনের পরিবর্তন আনে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

Exit mobile version