মতামতসর্বশেষ সংবাদ

হাদী একটি মৌলিক সেক্টরে হাত দিয়েছিলেন মুসলমানদের নিজস্ব সংস্কৃতির স্ফূরণ ঘটাতে

ইকবাল মাহমুদ :
শরীফ ওসমান হাদীর রাজনীতি নিয়ে ভারত খুব বিচলিত ছিলো, এটা আমি মনে করি না। বাংলাদেশে ডান, ইসলাম কিংবা উদারপন্থী রাজনীতির একটা প্রবল সম্ভাবনা আছে, এটা সবাই জানে। সেই সম্ভাবনায় হাদী হয়তো একটা অনন্য সংযোজন হতে পারতেন। কিন্তু হাদী একটি মৌলিক সেক্টরে হাত দিয়েছিলেন যা যুগপৎভাবে ভারত এবং পশ্চিমাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। তিনি মুসলমানদের নিজস্ব সংস্কৃতির স্ফূরণ ঘটাতে চেয়েছিলেন। সমাজ-সভ্যতায় ইসলামী তাহজিব-তামাদ্দুনের একটি সহজ এবং স্বাভাবিক অভিযোজন চেয়েছিলেন। যে সমাজ একটি ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে স্বীকৃতি দেয়ার মাঝে গৌরব খুঁজে, সে সমাজ ইসলামী সংস্কৃতি এবং জীবনাচারকে অবচেতন মনে নাক সিটকায়। নারীর পোশাকের স্বাধীনতার নামে বেহায়াপনাকে উৎসাহিত করে, অথচ একটা হিজাবী নারীকে শুধুমাত্র পর্দা করার কারণে মুলধারার বাইরে রাখতে চায়। শিক্ষক তার ক্লাসে দাড়ি-টুপিওয়ালা একজন শিক্ষার্থীকে সিঙ্গেল আউট করে হেফাজতের আমীর বলে তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করে। সিনেমায় ইসলামী পোশাক ও সংস্কৃতিবান লোকটাকে সবচেয়ে খারাপ চরিত্র হিসেবে যুগের পর যুগ প্রদর্শন করা হয়। আর এসবের মাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতি ও জীবনাচারের প্রতি প্রজন্মকে বিমুখ এবং ঘৃণাপ্রবণ করে তোলা হয়। এই অচলায়তন ভাংতে চেয়েছিলেন হাদী। তার এ লড়াই ছিলো সুদূরপ্রসারী। বিশেষত তরুণ সমাজের মনস্তত্ত্বে মুসলিম সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে ওঠা ট্যেবু ভাংতে চেয়েছিলেন তিনি। রাজনীতি দিয়ে তিনি দেশ পাল্টাতে চেয়েছিলেন, আর সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের মাধ্যমে পুরো সমাজটাকেই বদলে দেয়ার মিশন ছিলো তার। এই মিশনে সচেতনভাবে তিনি একটি উদারনৈতিক কর্মসূচি গ্রহন করেছিলেন। ইসলামী সংস্কৃতির অভ্যন্তরীণ ফেরকা চর্চাকে তিনি এড়িয়ে গেছেন। তাই তাকে কখনও দেখা গেছে রাজপথে মিলাদ-ক্বিয়াম করছেন, সহকর্মীদের নিয়ে মুড়ি- বাতাসার পার্টি করছেন, আবার কখনও নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার জাগরনী আবৃত্তিতে সবাইকে আন্দোলিত করছেন। হাদী ও তার সহকর্মীরা চলনে, বলনে স্মার্ট এবং আধুনিক। জ্ঞান এবং যুক্তিতে প্রখর ও ক্ষিপ্র। কিন্তু নামাজের সময় হলে সবাই দলবেঁধে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েন। এতে তার কোন সংকোচ নেই। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন ফজরের নামাজ আদায় করে। নিজের বিশ্বাস ও জীবনবোধকে তিনি চর্চা করতেন নিজের জীবনে।এখানে কোন ভন্ডামী ছিলো না।
জুলাই বিপ্লবের পর সতীর্থদের অনেকেই যখন ভোগবাদে জড়িয়ে নানা বদনাম হাসিল করেছেন হাদী তখন ইনকিলাব সেন্টারে জ্ঞান ও সংস্কৃতির অলাভজনক মিশনারী কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এটিই তার বিশেষত্ব, এখানেই তিনি আলাদা।
বাংলাদেশের ক্ষমতাপাগল রাজনৈতিক ধামড়ারা তার এ কাজের গভীরতা বুঝতে না পারলেও সাম্রাজ্যবাদী ও আধীপত্যবাদীরা ঠিকই তাকে নিয়ে বিচলিত হয়ে ওঠেছিলো। কারণ সারা দুনিয়ায় মুসলমানদের সংস্কৃতি কেড়ে নিয়ে একটা বিকলাঙ্গ জাতিতে পরিণত করে রেখেছে তারা। মুসলমানের বাচ্চারা আজ নামেই মুসলমান, চিন্তায়-দর্শনে, মননে-জীবনবোধে তারা বিজাতীয় সংস্কৃতি ধারণ করে। এমনকি কখনও কখনও মুসলমান পরিচয় দিতেও সংকোচ বোধ করে। এভাবে দিনে দিনে ইসলামের একটি অপভ্রংশ প্রজন্ম গড়ে ওঠেছে, যারা জীবন থেকে ইসলামকে আলাদা করে নিয়েছে। তারা মনে করে ইসলাম কেবল কয়েকটি আচার অনুষ্ঠানের নাম, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিদেশনীতি এসবে এর কোন একসেজ নেই। ইসলামী সংস্কৃতি এবং জীবনাচারে এরা গৌরববোধ করে না। এই অপভ্রংশ প্রজন্মকে বিজাতীয় সংস্কৃতিতে বুদ করে দেশে দেশে মুসলমানদের শাসন করে যাচ্ছে আধিপত্যবাদীরা। হাদী বুঝতে পেরেছিলেন সাংস্কৃতিক গোলামী থেকে মুক্ত করতে না পারলে মুসলমানদের পশ্চাদমুখীতা ঠেকানো যাবে না। সেজন্য যে বয়সে অন্যরা টাকা বানানোর নেশায়, আত্মপ্রতিষ্ঠার ধান্ধায় বিভোর থাকে, সে বয়সে একজন হাদী মুসলিম সংস্কৃতির অনবদ্য সব বয়ান তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন। এমন পাগলাটে, খ্যাপাটে, মেধাবী, ক্ষিপ্র এবং লক্ষ্যে অটুট তারুণ্যকে থামাতে না পারলে যে সামনে সমূহ বিপদ মতলববাজ গোষ্ঠীর!

লেখক : সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক , যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *