অনুক্ত কামরুলঅনুক্ত নিউজসর্বশেষ সংবাদ

গৃহবধূ থেকে আপোষহীন নেত্রী হয়ে উঠা বেগম খালেদা জিয়ার গল্প

একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে আপোষহীন নেত্রী হয়ে উঠা নারীর নাম বেগম খালেদা জিয়া!

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি ব্যতিক্রমী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বা সবচেয়ে জনপ্রিয় হিসেবে স্থায়ী স্থান দখল করে আছেন। একটা নবজাতক দলকে রাষ্ট্রের জনপ্রিয় দলে পরিণত করতে কত শত ঝঞ্ঝা ঝামেলা পোহাতে হয়েছে ,সেটা তিনি ছাড়া কেউ হয়তো বুঝতে পারবেন না!

তিনি তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন (১৯৯১–১৯৯৬, ফেব্রুয়ারি–মার্চ ১৯৯৬, এবং ২০০১–২০০৬) এবং দুইবার সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকা পালন করেন । তিনি শুধু দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীই নন, বরং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকার প্রধান হিসেবেও পরিচিত । তার রাজনৈতিক কর্মজীবন সামরিক স্বৈরশাসন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে বাংলাদেশের উত্তরণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের প্রধান অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে—১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের সফল নেতৃত্ব, ১৯৯১ সালে সংবিধানের ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে সংসদীয় পদ্ধতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা , যা বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব প্রদান করে। এছাড়া, তিনি নারী শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন, মুক্তবাজার অর্থনীতির জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেন , এবং অবকাঠামো উন্নয়নে (যেমন যমুনা বহুমুখী সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন) দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ।

তার আপোসহীন রাজনৈতিক অবস্থান এবং গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল আস্থা তাকে দেশের রাজনীতিতে ‘গণতন্ত্রের প্রতীক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে ।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন ছিল অপ্রত্যাশিত এবং আকস্মিক। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তার স্বামী, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, আততায়ীর হাতে নিহত হন ।

শেখ হাসিনা দেশে ফেরার মাত্র তিন দিন পরই জিয়া শহীদ হোন। শহীদ জিয়া কিন্তু আপাদমস্তক ভা রতের আধিপত্যবাদের বিরোধী ছিলেন! যদিও বিএনপি এখন সেই অবস্থানে নেই আর!

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গভীর সংকটে পতিত হয়। এই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিতে সদস্য হিসেবে যোগ দেন । দ্রুতই তিনি দলের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে উঠে আসেন।

মাত্র এক বছরের মধ্যে, ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই তিনি বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। এরপর ১৯৮৪ সালের আগস্ট মাসে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন ।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, রাজনীতিতে তার আকস্মিক প্রবেশ উত্তরাধিকারের ফল হলেও, এত দ্রুত দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ করা এবং তাকে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো প্রদান করা তার সহজাত সাংগঠনিক সক্ষমতা ও দ্রুত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতার পরিচায়ক। এই নেতৃত্ব গ্রহণের ফলেই দলটি সামরিক শাসনের মোকাবিলায় প্রস্তুত হয়।

সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপোসহীন অবস্থান
১৯৮২ সালের মার্চ মাস থেকে দেশে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর, বেগম খালেদা জিয়া প্রথম দিন থেকেই এই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদী ও আপোসহীন অবস্থান গ্রহণ করেন । তার এই অনমনীয় মনোভাবের কারণে তিনি দ্রুতই ‘আপোসহীন নেত্রী’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন । তিনি সামরিক শাসকের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় যেতে অস্বীকার করেন, যা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। ১/১১ এর ফখর উদ্দিন ও মঈন উদ্দিন সরকার তাঁকে দেশের বাহিরে যেতে চাপ দিলেও তিনি দেশ ছাড়েন নি। এমনকি শেখ হাসিনা এতো জু লুম করার পরও না।

তার নেতৃত্বে বিএনপি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন জোরদার করে। ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিএনপি সাত-দলীয় জোট গঠন করে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জোরালো কর্মসূচি শুরু করে । গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তার ব্যক্তিগত ত্যাগ ছিল প্রশ্নাতীত। প্রায় নয় বছর ধরে চলা এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনামলে তাকে মোট সাতবার আটক করা হয় ।
গণতন্ত্রের জন্য একজন নেত্রীর বারবার কারাবরণ করা তার রাজনৈতিক ভূমিকাকে ব্যক্তিগত আদর্শের স্তরে উন্নীত করেছিল। এই ব্যক্তিগত দৃঢ়তা ছিল সেই সময়ের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের একটি প্রধান চালিকাশক্তি।

১৯৮৬ সালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ যখন রাজনৈতিক চাপ প্রশমিত করতে একটি নির্বাচন ঘোষণা করেন, তখন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সেই নির্বাচন বয়কট করার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয় । এই সিদ্ধান্ত স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বৈধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে আরও গতিশীল করে তোলে। শেখ হাসিনা যখন ১৫৩ আসনে বিনা ভোটে এমপি সিলেকশন করেন তখনো গণতন্ত্র ফেরাতে চারদলীয় জোটের নেতা হিসেবে তিনি ভোট বর্জন করার ডাক দেন। শাহবাগ নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন ছিলো- এই মঞ্চ হাসিনার শাসনকে দীর্ঘায়িত করার জন্যই করা হয়েছে। যা শেষ পর্যন্ত সত্য প্রমাণ হয়।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে । এই বিজয়ের পর ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ তিনি দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন । কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বেনজির ভুট্টোর পর তিনি মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয় নারী যিনি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন । এটি লিঙ্গ নির্বিশেষে তার রাজনৈতিক সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।

একটা মজার বিষয় হলো, সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের সরাসরি ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার আইন পাস করেন এই বেগম খালেদা জিয়া-ই। এর আগে, মেয়র নির্বাচন করতেন ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। এই সংস্কার স্থানীয় প্রশাসনে জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতার মাত্রা বৃদ্ধি করে।

খালেদা জিয়ার ইসলামী দলগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন-ই তাঁকে ও তার দলকে আরো জনপ্রিয় করে তোলে!

৫ আগষ্টের পর ড. ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে যখন বিএনপির কিছু নেতা রাজপথে নামার কথা বলেন, তখন বেগম জিয়া বলেন ,’ এই সরকারকে সহযোগীতা করতে হবে’! তারপর বিএনপি চিন্তা ঘুরে যায়।

তিনি বরাবরই দেশ, দেশের মানুষের চিন্তাকে ধারণ করেই দলমতের উর্ধ্বে উঠে ‘আপোষহীন’ জনপ্রিয় নেত্রী হয়ে উঠেছেন! #অনুক্ত #অনুক্ত_কামরুল

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *