লিবিয়ায় অবস্থানরত এক প্রবাসীকে অপহরণ ও জিম্মি করে বাংলাদেশে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও অপহরণ চক্রের এক সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৯)। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের এক যুবককে লিবিয়ায় জিম্মি করে সিলেটে বসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওই চক্রের বিরুদ্ধে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি ২০২৬) রাতে সিলেটের বিয়ানীবাজার এলাকা থেকে অভিযুক্ত মো. ছাদেক আহমেদকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত ছাদেক বিয়ানীবাজার উপজেলার খাশির গ্রামের বাসিন্দা। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকালে তাকে জালালাবাদ থানায় হস্তান্তর করা হলে পুলিশ তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
পাসপোর্ট নবায়নের ফাঁদে জিম্মি দশা
মামলার এজাহার ও র্যাব সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী সুমন মিয়া নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার চর কিশোরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে প্রায় আট বছর আগে তিনি লিবিয়ায় পাড়ি জমান। প্রবাস জীবনে পরিচয় হয় আবু বক্কর নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গত বছরের (২০২৫) জুন মাসে নবায়নের জন্য আবু বক্করের শরণাপন্ন হন সুমন। কিন্তু এই বিশ্বাসই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। পাসপোর্ট নবায়নের অজুহাতে সুমনকে ডেকে নিয়ে জিম্মি করে ফেলে বক্কর ও তার সহযোগীরা।
দেশে ফোনকলে আর্তনাদ ও মুক্তিপণ আদায়
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। ওই দিন সুমন লিবিয়া থেকে তার পরিবারের সদস্যদের ফোনে জানান যে, আবু বক্কর ও তার ৩-৪ জন সহযোগী তাকে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখেছে। ফোনে পরিবারের কাছে দাবি করা হয় মোটা অংকের মুক্তিপণ। টাকা না দিলে সুমনকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে পরিবারের সদস্যরা সুমনের দেওয়া তিনটি বিকাশ নম্বরে ধাপে ধাপে মোট ৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা পাঠান।
টাকা পাঠানোর পরপরই সুমনের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ তিন মাস কোনো খোঁজ না পাওয়ার পর, গত বছরের ২০ ডিসেম্বর সকালে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে সুমনের ভাই রিয়াদ হোসেনের কাছে ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে দাবি করা হয় আরও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। টাকা না দিলে সুমনকে মেরে ফেলার চূড়ান্ত হুমকি দেয় অপহরণকারীরা।
মামলা ও র্যাবের অভিযান
টাকা দিয়েও ভাইয়ের মুক্তি না মেলায় এবং নতুন করে হুমকির মুখে ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর সুমনের ভাই রিয়াদ হোসেন বাদী হয়ে সিলেটের জালালাবাদ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আবু বক্করসহ অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জনকে আসামি করা হয়। মামলার সূত্র ধরে তদন্তে নামে র্যাব-৯। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়ে সোমবার রাতে বিয়ানীবাজারে অভিযান চালিয়ে মুক্তিপণের টাকা গ্রহণকারী চক্রের অন্যতম সদস্য ছাদেক আহমেদকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় বাহিনীটি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে র্যাব-৯-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম জানান, লিবিয়ায় বসে একটি চক্র প্রবাসীদের জিম্মি করে দেশ থেকে অর্থ আদায় করছে। গ্রেপ্তারকৃত ছাদেক এই চক্রের দেশীয় সহযোগী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের পর তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। চক্রের মূল হোতা ও অন্য পলাতক আসামিদের আইনের আওতায় আনতে র্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত ছাদেক কারাগারে রয়েছেন এবং পুলিশ রিমান্ডের আবেদনসহ পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।