প্রকৃতির নিয়মে বছর ঘুরে আবারও দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র রমজান মাস। ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে আগামী ১৮ বা ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সংযম ও আত্মশুদ্ধির এই মাস। তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবারের মতো এবারও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিমদের রোজা রাখার সময়ের ব্যাপ্তিতে দেখা যাবে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।
পঞ্জিকার আবর্তন ও ২০৩০ সালের বিশেষত্ব
ইসলামি হিজরি বর্ষপঞ্জি মূলত চন্দ্রনির্ভর। সৌরবছরের তুলনায় চন্দ্রবছর ১০ থেকে ১২ দিন কম হওয়ায় প্রতিবছর রমজান মাস এগিয়ে আসে। এই পরিক্রমায় ২০২৬ সালে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে রোজা হবে অপেক্ষাকৃত ছোট। আবহাওয়া ও মহাকাশীয় হিসাব বলছে, ২০৩১ সাল পর্যন্ত উত্তর গোলার্ধে রোজার সময় কমতে থাকবে।
মজার ব্যাপার হলো, ২০৩০ সালে মুসলিম বিশ্ব দুইবার রমজান মাস পালন করার বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হবে। ওই বছর প্রথম রমজান শুরু হবে ৫ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয়টি শুরু হবে ২৬ ডিসেম্বর।
উত্তর বনাম দক্ষিণ গোলার্ধ: সময়ের লড়াই
বর্তমানে উত্তর গোলার্ধে শীতকাল বিরাজ করায় সেখানকার বাসিন্দারা কিছুটা স্বস্তিদায়ক সময় পাবেন। শুরুর দিকে এসব অঞ্চলে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা রোজা রাখতে হবে। তবে মাস যত গড়াবে, দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোজার সময়ও কিছুটা বাড়বে।
বিপরীত চিত্র দেখা যাবে দক্ষিণ গোলার্ধে। চিলি, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোতে এবার রোজার দৈর্ঘ্য হবে গত বছরের তুলনায় বেশি। সেখানকার মুসলিমদের প্রথম দিকে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে মাসজুড়ে সেখানে সময় ক্রমান্বয়ে কমতে থাকবে।
এশিয় অঞ্চলের রোজার সূচি
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রথম দিনে রোজার ব্যাপ্তি হবে ১২ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট (সেহরি ৫:১৩, ইফতার ৫:৫৬)। তবে রমজানের শেষ দিকে এই সময় বেড়ে দাঁড়াবে ১৩ ঘণ্টা ২৩ মিনিটে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লিতে প্রথম রোজা ১২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিটের হলেও শেষ নাগাদ তা ১৩ ঘণ্টা ২৬ মিনিটে পৌঁছাবে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে প্রথম দিনের ১২ ঘণ্টা ২৯ মিনিটের রোজা শেষ দিনে ১৩ ঘণ্টা ২৯ মিনিটে গিয়ে ঠেকবে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে সময়ের পরিবর্তন খুব একটা বেশি নয়; সেখানে ১৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট দিয়ে শুরু হয়ে শেষ হবে ১৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিটে। থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কাতেও প্রায় ১৩ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সিয়াম পালন করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের চিত্র
ইসলামের পুণ্যভূমি সৌদি আরবের রিয়াদে প্রথম রোজা হবে ১২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটের। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও প্রায় একই সময় অর্থাৎ ১২ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট প্রথম দিনের রোজা পালিত হবে। তবে রমজান শেষে এই তিন দেশেই রোজার সময় দাঁড়াবে ১৩ ঘণ্টা ২৪ মিনিট।
ইউরোপ ও আমেরিকায় সময়ের পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে প্রথম রোজা মাত্র ১২ ঘণ্টা ১১ মিনিটের হলেও শেষ রোজাটি হবে ১৩ ঘণ্টা ৫০ মিনিটের। ইতালির রোমেও প্রায় একই চিত্র দেখা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রথম রোজা ১২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট এবং শেষ রোজাটি হবে ১৩ ঘণ্টা ১৪ মিনিটের।
ভাষার সীমানা পেরিয়ে রমজানের ঐক্য
পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন, দীর্ঘ ১ হাজার ৪০০ বছর আগে অবতীর্ণ পবিত্র কোরআনের শিক্ষায় ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি অর্জনের লক্ষ্যেই বিশ্ব মুসলিম রোজা পালন করবেন। আর এই আনন্দ ভাগ করে নিতে ভাষাগত ভিন্নতাও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আরবরা যেমন ‘রমজান কারিম’ বলে শুভেচ্ছা জানান, তেমনি বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানে ‘রমজান মোবারক’ বহুল প্রচলিত। তুর্কিদের কণ্ঠে শোনা যায় ‘রমাজান আয়িনিজ মুবারক ওলসুন’ আর স্প্যানিশরা বলেন ‘ফেলিজ রামাদান’।
ভৌগোলিক দূরত্ব আর সময়ের পার্থক্য থাকলেও এই এক মাস বিশ্বজুড়ে এক অনন্য আধ্যাত্মিক ঐক্য ও সহমর্মিতার আবহাওয়া বিরাজ করে।