বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিজেদের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ধনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবি করলেও, এর বিলাসবহুল কাঠামোর ভিত্তি মূলত সাধারণ মানুষের আবেগ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে বিসিবি সরকারি করের টাকায় চলে না, তাই জনতার কাছে তাদের জবাবদিহিতা কম। কিন্তু অর্থনীতির গভীর বিশ্লেষণ বলছে ভিন্ন কথা। ক্রিকেট ভক্তরা যদি স্টেডিয়ামে যাওয়া বা টিভির পর্দায় চোখ রাখা বন্ধ করে দেয়, তবে ধসে পড়তে পারে বোর্ডের আয়ের বিশাল সাম্রাজ্য।
আয়ের উল্লম্ফন বনাম আইসিসির শর্ত
বিগত কয়েক বছরে বিসিবির আয়ের গ্রাফ অবিশ্বাস্যভাবে ঊর্ধ্বমুখী। ২০২১-২২ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) থেকে যেখানে বিসিবির আয় ছিল ১৩১ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩৮ কোটি টাকায়। একই সময়ে টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয় ৩৮ কোটি থেকে এক লাফে ১২৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
তবে এই বিপুল অর্থের প্রবাহের পেছনে রয়েছে আইসিসির একটি কঠোর শর্ত। ফুল মেম্বারশিপ বা পূর্ণ সদস্যপদ টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিটি বোর্ডকে প্রমাণ করতে হয় যে, আইসিসির অনুদান ছাড়াও তারা অন্তত ১০ শতাংশ আয় নিজেরা জেনারেট করতে সক্ষম। এই ‘নিজস্ব আয়’ মূলত আসে স্পনসরশিপ, টিকেট বিক্রি এবং মিডিয়া স্বত্ব থেকে। আর এই সবকটি খাতের চালিকাশক্তি হলো সাধারণ দর্শক। দর্শক না থাকলে টিআরপি থাকে না, আর টিআরপি না থাকলে স্পনসর বা টিভি চ্যানেল—কেউই লগ্নি করতে আগ্রহী হয় না।
অশনি সংকেত: জিম্বাবুয়ে সিরিজের শিক্ষা
দর্শক আগ্রহ কমলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে, তার সদ্য উদাহরণ ২০২৪ সালের জিম্বাবুয়ে সিরিজ। দর্শকদের আগ্রহ তলানিতে থাকায় কোনো টিভি চ্যানেল এই সিরিজের মিডিয়া স্বত্ব কিনতে চায়নি। বাধ্য হয়ে বিটিভিকে বিনামূল্যে খেলাটি সম্প্রচার করতে দেওয়া হয়েছিল। এটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়; পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (PCB) এবং ইংল্যান্ডের (ECB)-এর মতো প্রভাবশালী বোর্ডগুলোও বর্তমানে ভিউয়ারশিপ বা দর্শক কমার কারণে মিডিয়া স্বত্ব বিক্রিতে হিমশিম খাচ্ছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের দর্শকরা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আইসিসির অনুদান পাওয়ার যোগ্যতাও হারাতে পারে বিসিবি।
মাঠের ক্রিকেট বনাম মাঠের বাইরের রাজনীতি
বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটি অভিনব সংস্কৃতি চালু হয়েছে, যা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে বিরল। ভারত, শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা রাজনীতিতে জড়ালেও তা সাধারণত অবসরের পর। ভারতে বৈভব সূর্যবংশীর মতো তরুণদের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করা হয় কেবল ভোটদানে সচেতনতা বাড়াতে, কোনো দলের হয়ে নয়।
অথচ বাংলাদেশে সাকিব আল হাসান বা মাশরাফি বিন মর্তুজার মতো তারকাসমৃদ্ধ ক্রিকেটাররা সক্রিয়ভাবে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সময়ই সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছেন। খেলার মাঠে মনোযোগের চেয়ে রাজনৈতিক ব্যস্ততা এবং মাঠের বাইরের বিতর্ক অনেক সময় পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আবেগের পারদ ও মুখের স্ট্রাইক রেট
বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা আবেগের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা। তাদের দৈনন্দিন মেজাজ অনেক সময় নির্ধারিত হয় জাতীয় দলের জয়-পরাজয়ের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স এবং আচরণের বৈপরীত্য ভক্তদের সেই আবেগে আঘাত করছে।
মাঠে রান খরা বা বাজে বোলিংয়ের পরেও ক্রিকেটারদের দম্ভোক্তি সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচকরা কটাক্ষ করে বলছেন, বর্তমানে ক্রিকেটারদের ব্যাটের স্ট্রাইক রেট যেখানে ৮০-র ঘরে আটকে আছে, সেখানে তাদের ‘মুখের স্ট্রাইক রেট’ ৩৮০ ছাড়িয়ে গেছে।
উপসংহার
দিনশেষে বিসিবি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আদলে চললেও, এর মূল পুঁজি কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স নয়—বরং সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। জনগণ খেলা দেখা বন্ধ করলে স্পনসর আসবে না, টিভি স্বত্ব বিক্রি হবে না এবং আইসিসির ফান্ডের পথও রুদ্ধ হবে। অর্থাৎ, পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ক্রিকেট সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা বা সমর্থনের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। তাই দর্শক বিমুখ হলে বিসিবির এই আয়ের জৌলুস নিভে যেতে সময় লাগবে না।