ক্ষমতায় গেলে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ এবং গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে ঢেলে সাজাতে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরেছে দলটি।
মঙ্গলবার (আজ) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ‘পলিসি সামিট-২০২৬’-এ দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান এই রূপরেখা উপস্থাপন করেন। সম্মেলনে রাষ্ট্র পরিচালনায় জামায়াতের নীতি ও অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিকল্পনাগুলো বিশদভাবে তুলে ধরা হয়।
শিক্ষা ও নারী উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিকল্পনা
শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে জামায়াত। ঢাকার তিনটি শীর্ষস্থানীয় মহিলা কলেজকে এক করে একটি আন্তর্জাতিক মানের নারী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
মেধাবীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে দলটি বিশেষ স্কলারশিপ ও ঋণ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীকে মাসিক ১০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ প্রদান।
- হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, এমআইটি ও কেমব্রিজের মতো বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া ১০০ শিক্ষার্থীকে প্রতিবছর সুদমুক্ত ঋণ ও বৃত্তি প্রদান।
বেকারত্ব দূরীকরণ ও তরুণদের কর্মসংস্থান
যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে জামায়াত ‘ভিশন ২০৪০’ সামনে রেখে আইসিটি ও কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনা সাজিয়েছে। দলটির প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- আগামী ৫ বছরে ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) তরুণকে বাজারভিত্তিক কারিগরি ও স্কিল প্রশিক্ষণ প্রদান।
- শিক্ষাজীবন শেষে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত ৫ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত মাসিক ১০ হাজার টাকা ‘বেকার ভাতা’ বা সুদমুক্ত ঋণ সহায়তা।
- প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ এবং জেলায় ‘জব ইয়ুথ ব্যাংক’ স্থাপনের মাধ্যমে ৫ বছরে ৫০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি।
- ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি এবং আইসিটি খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা।
স্বাস্থ্যসেবায় মানবিক উদ্যোগ
স্বাস্থ্যখাতকে বিকেন্দ্রীকরণ ও সহজলভ্য করার লক্ষ্যে ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। এছাড়া সমাজের সবচেয়ে নাজুক অংশের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসুবিধার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের প্রবীণ নাগরিক এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে গর্ভকালীন সময় থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর পুষ্টি নিরাপত্তা সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতায় আনা হবে।
অর্থনীতি ও শিল্পায়ন: কর হ্রাস ও দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স
অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন শফিকুর রহমান। ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে ট্যাক্স ও ভ্যাটের হার কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, করের হার ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।
শিল্পখাত রক্ষায় জামায়াতের প্রতিশ্রুতি:
- আগামী তিন বছর শিল্প কারখানায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল বাড়ানো হবে না।
- বন্ধ কলকারখানাগুলো পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে চালু করা হবে এবং শ্রমিকদের ১০ শতাংশ মালিকানা দেওয়া হবে।
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণের ব্যবস্থা থাকবে।
- সকল নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে এনআইডি, টিআইএন এবং স্বাস্থ্য কার্ডের সমন্বয়ে ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড’ চালু করা হবে।
কূটনৈতিক উপস্থিতি ও বিশিষ্টজনদের অংশগ্রহণ
‘পলিসি সামিট-২০২৬’ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রাষ্ট্রদূত এবং কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাউদ্দিন বাবরসহ দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদগণ। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে প্রবাসী পেশাজীবী ও গবেষকদের দেশে কাজে লাগানোর জন্য ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ ধারণাটিও সম্মেলনে গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হয়।