বিগত দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা: ছোট কিন্তু ‘চৌকস’ মন্ত্রিসভা গড়ছেন তারেক রহমান

দীর্ঘ ১৯ বছর পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হতে যাওয়া বিএনপি তাদের মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের চমক দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামীকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে এবারের মন্ত্রিসভা বিগত ২০০১ সালের মতো বিশাল বহরের হচ্ছে না। বরং ‘দক্ষতা ও তারুণ্যের’ সমন্বয়ে একটি ছোট ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।

আকারে ছোট, কার্যকারিতায় বড়
বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৩৫ থেকে ৩৭ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এর মধ্যে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে ২৬-২৭ জন এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ৯-১০ জনের নাম আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপির মন্ত্রিসভা ৬০ সদস্যের হওয়ায় যে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল, এবার সেই পথে হাঁটতে চান না তারেক রহমান। বিগত দিনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসনের ব্যয় সংকোচন ও গতিশীলতা আনতেই মন্ত্রিসভা ছোট রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেল
নতুন মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহল। জানা গেছে, অভিজ্ঞ প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি এবার মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে যাচ্ছেন একঝাঁক দক্ষ ও মেধাবী তরুণ নেতা। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সালাহউদ্দিন আহমদের মতো ঝানু রাজনীতিকরা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন—এটি অনেকটা নিশ্চিত। এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ওসমান ফারুকের মতো জ্যেষ্ঠ নেতারা। পাশাপাশি পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের টেকনোক্র্যাট কোটায় যুক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে।

অতীতের কালিমা মোচনের চ্যালেঞ্জ
বিগত ২০০১-০৬ মেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের ‘খাম্বা’ দুর্নীতি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিতর্কিত ভূমিকা এবং নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার যে অপবাদ ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসতে মরিয়া বিএনপি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন দলটির প্রধান লক্ষ্য। তাই বিতর্কিত বা অতীতে ব্যর্থ হয়েছেন এমন নেতাদের বদলে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জন্য এবার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নাম বাছাই করা হচ্ছে।

জাতীয় ঐক্যের নতুন বার্তা
তারেক রহমান কেবল দলীয় সরকার নয়, বরং একটি ‘জাতীয় ঐকমত্যের’ সরকার গড়ার পথে হাঁটছেন। নির্বাচনের পর প্রতিশোধের রাজনীতির বদলে তিনি যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ডাক দিয়েছেন, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে তাঁর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে। শপথ গ্রহণের আগেই তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিভাজন দূর করে সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার এই উদ্যোগ রাজনীতিতে এক ইতিবাচক ধারার সূচনা করবে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারই অগ্রাধিকার
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ট্র্যাকে ফেরানো। তারেক রহমান নিজেও তার বক্তব্যে আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশের মানুষের আস্থা ফেরাতে মন্ত্রিসভায় যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি একটি শক্তিশালী ‘সিগন্যাল’ হিসেবে কাজ করবে।

সব মিলিয়ে, আগামীকাল যে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিতে যাচ্ছে, তা কেবল সরকার গঠন নয় বরং বিএনপির জন্য একটি ভাবমূর্তি পরিবর্তনের পরীক্ষা। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই দল কি পারবে অতীতের ভুল শুধরে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে আগামীকালের সেই সম্ভাব্য নামের তালিকার মধ্যেই।

Exit mobile version