বাংলাদেশসর্বশেষ সংবাদ

পাহাড়ের গহিনে অস্ত্রধারীদের ‘সাম্রাজ্য’: অভিযানে গেলেই ঝরে রক্ত, জঙ্গল সলিমপুরে অসহায় রাষ্ট্রযন্ত্র

চট্টগ্রাম নগরের উপকণ্ঠ সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। কাগজে-কলমে এটি সরকারি খাসজমি হলেও বাস্তবে এটি যেন বাংলাদেশের ভেতরেই এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বা ‘মিনি ক্যান্টনমেন্ট’। এখানে রাষ্ট্রের আইন চলে না, চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিজস্ব সংবিধান। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতিগুলোতে ঢোকার সাধ্য নেই সাধারণ মানুষের, এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলে বরণ করতে হয় রক্তাক্ত পরিণতি।

পাহাড়ের মাঝখানের এই সড়ক ধরে ঢুকতে হয় জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে। সম্প্রতি তোলাছবি: জুয়েল শীল

সম্প্রতি অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক র‍্যাব কর্মকর্তার নিহতের ঘটনা এবং তিনজন সদস্যের আহত হওয়ার বিষয়টি জঙ্গল সলিমপুরের ভয়াবহতা আবারও সামনে এনেছে। গত তিন দশক ধরে কীভাবে এই এলাকাটি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এবং কেন প্রশাসন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, তার পেছনের চিত্রটি উদ্বেগজনক।

সন্ত্রাসীদের নিজস্ব ‘পাহাড় দুর্গ’
চট্টগ্রামের বায়েজীদ বোস্তামী থানা সংলগ্ন এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির ঠিক বিপরীতে, লিংক রোডের উত্তরে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর জায়গা নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই এলাকাটি প্রাকৃতিকভাবেই দুর্গম। সন্ত্রাসীরা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থান নিয়ে পুরো এলাকার ওপর নজরদারি চালায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সন্ত্রাসীরা গড়ে তুলেছে নিজস্ব ‘চেকপোস্ট’ ব্যবস্থা। এলাকার প্রবেশপথগুলোতে বসানো হয়েছে লোহার গেট। সেখানে সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকে সশস্ত্র ক্যাডাররা। এই এলাকায় বসবাসকারীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) ইস্যু করা হয়। পরিচয়পত্র ছাড়া কেউ এই ‘সাম্রাজ্যে’ ঢুকতে পারেন না। কোনো আত্মীয়-স্বজন বা দর্শনার্থী আসতে চাইলে আগে থেকে ফোনে অনুমতি নিতে হয় এবং গেট থেকে বাসিন্দারা এসে তাদের নিয়ে যান। এই কড়াকড়ির মূল উদ্দেশ্য—পুলিশ বা প্রশাসনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা।

প্লট বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অর্থনীতি
সরকারি পাহাড় কেটে সাবাড় করার নেপথ্যে রয়েছে হাজার কোটি টাকার ‘প্লট বাণিজ্য’। নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাসের হাত ধরে এখানে পাহাড় দখল শুরু হয়। পরবর্তীতে তা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের হাতে চলে যায়।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বেদখল হওয়া এই ৩ হাজার ১০০ একর জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এখানে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে আড়াই কাঠা বা দুই কাঠার প্লট বিক্রি হয় ৫ থেকে ৩০ লাখ টাকায়। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে ‘ছিন্নমূল সমিতি’ বা ‘আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি’র সদস্য বানিয়ে তাদের কাছে অবৈধভাবে এই সরকারি জমি বিক্রি করা হয়। প্লট বিক্রির পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি ও নিরাপত্তার নামে বাসিন্দাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসিক চাঁদা আদায় করে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো।

ক্ষমতার পালাবদল, কিন্তু দখলদারিত্ব একই
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। আগে এই এলাকার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি এস এম আল মামুনের অনুসারী ইয়াসিন বাহিনীর হাতে। বর্তমানে সেই নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন ও তার অনুসারীরা।

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি অডিও রেকর্ডে ৬০ লাখ টাকার অস্ত্র কেনার কথা বলতে শোনা যায়, যা রোকন উদ্দিনের বলে পুলিশ সন্দেহ করছে। রেকর্ডে বলতে শোনা যায়, “ছিন্নমূলে আমি যুদ্ধ করতে রাজি আছি। ৫০-৬০ লাখ টাকার অস্ত্র কিনেছি… বহিরাগত কেউ নেতৃত্ব দিতে পারবে না।” অর্থাৎ, ক্ষমতার হাতবদল হলেও অস্ত্রবাজি ও দখলদারিত্বের সংস্কৃতি এখানে অপরিবর্তিত। গত ১৪ মাসে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে এখানে অন্তত চারজন খুন হয়েছেন।

অভিযানে গেলেই বিপদ
জঙ্গল সলিমপুর ভৌগোলিকভাবে এমন এক অবস্থায় রয়েছে, যেখানে নিচ থেকে কেউ প্রবেশ করলেই পাহাড়ের ওপর থেকে তা স্পষ্ট দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি দেখামাত্রই পাহারাদাররা সংকেত দেয়। এরপর ওপর থেকে বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ শুরু করে সন্ত্রাসীরা।

২০২২ ও ২০২৩ সালে জেলা প্রশাসন এবং পুলিশের একাধিক অভিযানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ম্যাজিস্ট্রেট, ওসি এবং পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে আহত হয়েছেন। সর্বশেষ র‍্যাবের অভিযানে কর্মকর্তার মৃত্যু প্রমাণ করে, সন্ত্রাসীরা এখন কতটা বেপরোয়া। পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসানের মতে, “কেবল অভিযান চালিয়ে এদের সরানো সম্ভব নয়, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও যৌথ বাহিনী ছাড়া পাহাড় রক্ষা করা যাবে না।”

থমকে আছে সরকারি মেগা প্রকল্প
সরকার এই এলাকাটিকে ঘিরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২, আইটি পার্ক, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটারসহ ১১টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। বিশেষ করে নগর কারাগারের বন্দী চাপ কমাতে এখানে ৫০ একর জমিতে নতুন কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, জমির দখল বুঝে না পাওয়ায় এসব প্রকল্পের কোনোটিই আলোর মুখ দেখছে না। প্রায় ৪৮টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখানে স্থাপনা নির্মাণের আবেদন করলেও, সন্ত্রাসীদের দাপটে জেলা প্রশাসন জমি বুঝিয়ে দিতে পারছে না। ফলে হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন সম্ভাবনা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

উত্তরণের উপায় কী?
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, জঙ্গল সলিমপুরের সমস্যা এখন আর সাধারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের ভাষ্যমতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে এই দুর্ভেদ্য ঘাঁটি ভাঙা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সেনাবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদী যৌথ অভিযান। একইসঙ্গে অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং পাহাড়ের প্রবেশপথগুলো পুরোপুরি সিলগালা করে সন্ত্রাসীদের রসদ সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। অন্যথায়, চট্টগ্রামের বুকে এই ‘সন্ত্রাসীদের রাজ্য’ দিন দিন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *